পবিত্র “ঈদুল ফিতর” মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের জন্য কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো:
ছবি মুক্তিবাণী
করণীয় (যা করা উচিত): 1.ঈদের নামাজ আদায় করা – ঈদুল ফিতরের দিনে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা।
2. সদকাতুল ফিতর আদায় করা – ঈদের নামাজের আগেই গরিব-দুঃখীদের মধ্যে ফিতরা বিতরণ করা।
3. গোসল করা ও উত্তম পোশাক পরা–পবিত্রতা অর্জন করে সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা।
4.তাকবির বলা – ঈদের দিনে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ” বলা।
5. আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা– ঈদের মোবারকবাদ দেওয়া ও নেওয়া।
6. গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা ও খোঁজখবর নেওয়া – তাদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা।
7. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা–রমজানের রোজা ও ইবাদতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
বর্জনীয় (যা এড়িয়ে চলা উচিত):
1. ঈদের নামাজ ত্যাগ করা – এটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া উচিত নয়।
2. অপচয় ও অপব্যয় করা – অহেতুক খরচ বা বিলাসিতা থেকে বিরত থাকা।
3. গীবত, পরনিন্দা ও ঝগড়া-বিবাদ করা – ঈদের দিনে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা।
4. অশ্লীল বা অপ্রীতিকর আচরণ করা–ঈদের পবিত্রতা রক্ষা করা।
5. নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা – ফিতরা ঈদের নামাজের পূর্বেই আদায় করা উত্তম।
ঈদুল ফিতর হলো আনন্দ, ক্ষমা ও সাম্যের দিন। এই দিনে আমরা আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করি, গরিব-দুঃখীদের সহযোগিতা করি এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখি।
ঈদের দিন গান বাজনা শোনা বা বাজানোর বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ঈদে গান-বাজনার সাধারণ বিধান
ইসলামে সাধারণত গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারকে মাকরূহ বা নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষত যখন তা অশ্লীলতা, অহংকার বা অন্য কোনো হারাম কাজের দিকে নিয়ে যায়। তবে ঈদের দিনে আনন্দ প্রকাশের কিছু বিশেষ রূপ ইসলামে স্বীকৃত, যেগুলো শরিয়তের সীমার মধ্যে রয়েছে।
২. ঈদে আনন্দ প্রকাশের পদ্ধতি
নবী কারীম (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিনে শরিয়তসম্মত উপায়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন, যেমন:
• তাকবির পাঠ (আল্লাহু আকবার বলা)।
• ঈদের নামাজ ও খুতবা শরিয়তের অন্যতম আনুষ্ঠানিকতা।
• পরস্পর শুভেচ্ছা বিনিময় (ঈদ মুবারাক বলা)।
৷تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
বাংলা উচ্চারণ: তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম
বাংলা অর্থ:“আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে এবং তোমাদের কাছ থেকে (ইবাদত ও ভালো কাজ) কবুল করুন।”
• উপযুক্ত পোশাক পরিধান ও সুগন্ধি ব্যবহার।
এসব পদ্ধতি ছাড়া “বাদ্যযন্ত্র বা গান-বাজনার মাধ্যমে ঈদ উদযাপন” রাসূল (ﷺ) বা সাহাবাদের যুগে প্রমাণিত নয়।
৩. হাদিসের রেফারেন্স
• বাদ্যযন্ত্রের সাধারণ নিষেধাজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ
“আমার উম্মতের কিছু লোক এমন হবে যারা জিনা, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৯০)
এই হাদিসে “মা‘আজিফ” (বাদ্যযন্ত্র) কে হারাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
• ঈদের দিনে আনন্দের বৈধ পদ্ধতি:
আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন: «أَنَّ أَبَا بَكْرٍ دَخَلَ عَلَيْهَا وَعِنْدَهَا جَارِيَتَانِ فِي أَيَّامِ مِنًى تُغَنِّيَانِ… فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَمَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ: «دَعْهُمَا يَا أَبَا بَكْرٍ، فَإِنَّهَا أَيَّامُ عِيدٍ»»
এই হাদিসের ব্যাখ্যা: এখানে শুধু ঢোল বা ডফ (এক ধরনের সরল বাদ্য”আবু বকর (রাঃ) ঈদের দিন আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে দেখলেন দুই কন্যা বাদ্য সহকারে গান গাইছে… আবু বকর (রাঃ) বললেন: ‘রাসূল (ﷺ)-এর কাছে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র?’ রাসূল (ﷺ) বললেন: ‘হে আবু বকর, তাদের ছেড়ে দাও, কারণ এগুলো ঈদের দিন।’”(সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৯৫২; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৯২) ) ব্যবহারের অনুমতি ছিল, যা নারীদের দ্বারা বাজানো হচ্ছিল এবং তা কোনো অশ্লীল গান ছিল না। আধুনিক যুগের জটিল বাদ্যযন্ত্র বা হারাম গান এই হাদিস দ্বারা বৈধ হয় না।
৪. ফুকাহাদের মতামত
• ইমাম মালিক, শাফিঈ ও আহমদ (রহ.)-এর মতে, বাদ্যযন্ত্র সাধারণভাবে নিষিদ্ধ, তবে ঈদের দিনে “ডফ (ঢোল)’ বাজানো নারীদের জন্য বৈধ (যদি তা অশ্লীলতা বা ফিতনার দিকে না নিয়ে যায়)।
• ইমাম আবু হানিফা (রহ.) -এর মতে, সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ, এমনকি ঈদের দিনেও।
৫. সতর্কতা: ঈদের নামে আজকাল অনেক আধুনিক গান-বাজনা, নাচ-গান বা মিশ্র সঙ্গীতের আয়োজন করা হয়, যা সম্পূর্ণ হারাম। এগুলো ঈদের সুন্নত নয় বরং বেদ‘আত ও গুনাহের কাজ।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: ঈদের দিনে শরিয়তসম্মত আনন্দ (তাকবির, দোয়া, সালাম বিনিময়) করা যাবে।
• বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার বা আধুনিক গান-বাজনা করা শরিয়তসম্মত নয়, কারণ তা হাদিসে নিষিদ্ধ।
• শুধু নারীদের জন্য ডফ (ঢোল) বাজানো বিশেষ অবস্থায় বৈধ হতে পারে, যদি তা অশ্লীলতা বা ফিতনা থেকে মুক্ত থাকে।
• আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈদ শরিয়তের সীমার মধ্যে উদযাপন করার তাওফিক দিন আমীন!
উৎস: ১. সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৯০, ৯৫২
২. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৯২
৩. ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু (ড. ওয়াহবা যুহাইলী)
৪. আল-মুগনী (ইবনে কুদামা)
সর্বশেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১৫:২৯
পাঠকের মন্তব্য