মাহে রমজানের ২২তম তারাবিহ নামাজে সাধারণত কুরআন মাজিদের ২২তম পারা তেলাওয়াত করা হয়। এই পারায় সূরা আল-আহযাব (৩৩) এর শেষ অংশ থেকে শুরু হয়ে সূরা ইয়াসীন (৩৬) পর্যন্ত রয়েছে। এই পারার মূল বিষয়বস্তু এবং সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:
সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯-৭৩)
√ এই অংশে মুমিনদের নৈতিক ও সামাজিক আচরণ, বিশেষ করে নারীদের পর্দা সম্পর্কিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
√ আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
√ মুনাফিকদের চরিত্র এবং তাদের কুফরির পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে।
√ মুমিনদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে এবং ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে।
সূরা সাবা (৩৪:১-৫৪)
√ এই সূরায় আল্লাহর মহিমা এবং তাঁর অসীম ক্ষমতার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
√ পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনী এবং তাদের সম্প্রদায়ের পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে।
√ দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা এবং আখিরাতের জীবনের স্থায়ী সুখের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
√ কাফিরদের ভ্রান্ত ধারণা এবং তাদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
সূরা ফাতির (৩৫:১-৪৫)
√ এই সূরায় আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন এবং তাঁর একত্বের প্রমাণ বর্ণনা করা হয়েছে।
√ মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তাঁর নির্দেশনা মেনে চলা।
√ দুনিয়ার জীবনের মোহ এবং আখিরাতের জীবনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
√ আল্লাহর রহমত এবং ক্ষমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা ইয়াসীন (৩৬:১-৮৩)
√ এই সূরাকে কুরআনের “হৃদয়” বলা হয়। এটি তাওহিদ, রিসালাত এবং আখিরাতের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করে।
√ পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনী এবং তাদের সম্প্রদায়ের অবাধ্যতার পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে।
√ মৃত্যু পরবর্তী জীবন, পুনরুত্থান এবং হিসাব-নিকাশের কথা বলা হয়েছে।
√ আল্লাহর ক্ষমতা এবং তাঁর সৃষ্টির নিদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
২২তম পারায় আল্লাহর একত্ব, নবীদের দাওয়াত, মানুষের কর্তব্য, দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা এবং আখিরাতের জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এই পারায় মুমিনদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে, তাঁর নির্দেশনা মেনে চলতে এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।
কুরআন মজিদের ২২ নম্বর পারা (সূরা আল-আহযাবের শেষ অংশ থেকে সূরা ইয়াসীন পর্যন্ত) সমসাময়িক বিষয়গুলোর উপর মুসলিম উম্মাহর জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা, আদেশ ও নিষেধ রয়েছে। এই পারায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা রয়েছে, যেমন সূরা আল-আহযাব, সূরা সাবা, সূরা ফাতির এবং সূরা ইয়াসীন। এই সূরাগুলোতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে জীবনযাপন, সমাজ ও ধর্মীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিচে এই পারার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদেশ-নিষেধ ও শিক্ষা উল্লেখ করা হলো:
১. আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের অনুসরণ (সূরা আল-আহযাব)
√ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) আদেশ মান্য করা এবং তাদের অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৬)
√ মুমিনদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবনই উত্তম আদর্শ। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১)
√ নারী-পুরুষের মধ্যে শালীনতা বজায় রাখা এবং অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩২-৩৩)
২. সমাজিক দায়িত্ব ও ন্যায়বিচার (সূরা আল-আহযাব)
√ ইয়াতিমদের প্রতি সদয় ব্যবহার এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬)
√ দুর্বল ও অসহায়দের সাহায্য করা এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৮)
৩. আল্লাহর উপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল (সূরা আল-আহযাব)
√ আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং সকল পরিস্থিতিতে তাঁর সাহায্য কামনা করা। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩)
√ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের জন্য সর্বদা প্রার্থনা করা। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭৩)
৪. আল্লাহর সৃষ্টি ও মহিমা (সূরা ফাতির)
√ আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শনগুলো সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা এবং তাঁর মহিমা উপলব্ধি করা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ২৭-২৮)
√ আল্লাহর অনুগ্রহের শুকরিয়া আদায় করা এবং তাঁর নেয়ামতের অপব্যবহার না করা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩)
৫. কিয়ামত ও পরকালের স্মরণ (সূরা ইয়াসীন)
√ কিয়ামতের দিনের কথা স্মরণ করা এবং পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫১-৫৩)
√ মৃত্যু ও পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং আল্লাহর বিচার দিবসের জন্য প্রস্তুত থাকা। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৭৮-৮৩)
৬. অহংকার ও গর্ব পরিহার (সূরা সাবা)
√ অহংকার ও গর্ব পরিহার করা এবং বিনয়ী হওয়া। (সূরা সাবা, আয়াত: ৩১-৩৩)
√ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার না করা এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার করা। (সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯)
৭. সত্যের দিকে আহ্বান ও সতর্কতা (সূরা ইয়াসীন)
√ সত্যের দিকে আহ্বান করা এবং মিথ্যা থেকে সতর্ক থাকা। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৬০-৬১)
√ আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হওয়া এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৭০)
৮. আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা (সূরা ফাতির)
√ আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস রাখা এবং শিরক থেকে দূরে থাকা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১৩-১৪)
√ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১৫)
৯. দুনিয়ার জীবনের মোহ পরিহার (সূরা ফাতির)
√ দুনিয়ার জীবনের মোহ ও লোভ থেকে দূরে থাকা এবং আখিরাতের জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ৫)
√ আল্লাহর স্মরণে সময় দেওয়া এবং দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়ী সুখের পিছনে না ছোটা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১৮)
১০. সৎকর্ম ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন (সূরা ফাতির)
√ সৎকর্ম করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১০)
√ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের জন্য সর্বদা প্রার্থনা করা। (সূরা ফাতির, আয়াত: ২৯)
এই পারায় উল্লিখিত আদেশ-নিষেধ ও শিক্ষাগুলো মুসলিম উম্মাহর জন্য জীবনযাপন, সমাজ ও ধর্মীয় বিষয়ে পথনির্দেশনা প্রদান করে। এগুলো মেনে চললে ব্যক্তি ও সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।
সর্বশেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৫, ০৩:৪৯
পাঠকের মন্তব্য